তবু আফগানিস্তানের বাংলাওয়াশই!

মনে হচ্ছিল দেরিতে হলেও ঘুম ভেঙেছে বাংলাদেশের। আহত বাঘের মতো খোঁচা লেগে গর্জে উঠেছে। ১২ বলে ৩০ লাগে এমন কঠিন সমীকরণও মুশফিক সহজ করে দিলেন টানা ৫ চারে। প্রতিটা শটে ফুটে উঠছিল কী প্রত্যয়! রশিদের শেষ ওভারের প্রথম বলে মুশফিক ফিরে এলেও হাল ছাড়েনি বাংলাদেশ। লড়ে গেল শেষ ওভারের শেষ বল পর্যন্ত। কিন্তু ওই বলে নাটকীয়তার রোমাঞ্চই জাগাতে পারল শুধু। হেরে গেল মাত্র ১ রানে।

এত এত চেষ্টার পরও আফগানিস্তানের দেওয়া ১৪৬ রানের লক্ষ্য ছোঁয়া হলো না। ৬ উইকেটে থামল ১৪৪ রান করে। ষষ্ঠ উইকেটটি মাহমুদউল্লাহর রান আউট। দুই বলে ৫ রান দরকার, স্ট্রাইকিং প্রান্তে মাহমুদউল্লাহ। বল করছেন রশিদ। মাহমুদউল্লাহকে চার মারতেই হবে। মাহমুদউল্লাহ নিতে পারলেন ১ রান। ব্যাটিং প্রান্তে গেলেন অনভিজ্ঞ আরিফ। জিততে ৪ রান দরকার, ১টাই বল। আরিফ ভালোই চেষ্টা করলেন। বল গেল লং অনে। আফগান ফিল্ডার শফিক কোনো মতে বল থামালেন।

কিন্তু পর্দাথবিদ্যার সূত্র মেনে তবু বল এক বাউন্সে সীমানাই পেরিয়ে গেল। শফিক টাল সামলে হাতের থাবায় বল ফেরালেন। বল সীমানার ওপারে। ফিল্ডারের পাও। কিন্তু দুটোই ছিল শূন্যে। রিপ্লে তা-ই দেখাল। তৃতীয় আম্পায়ার চার বললেন না। বরং বললেন, মাঠের সীমানায় যখন এতসব ঘটনা ঘটছে, তবু দৌড়ে তিনটা রান নিতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। তৃতীয় রানটায় একটু কি ধীর ছিলেন? ক্রিজে পৌঁছানোর বদলে উদ্বেগের চোখে তাকাচ্ছিলেন বলটা চার হলো কি না! ঠিক বোঝা গেল না। হয়তো তিনটা রান হতো, হয়তো হতো না। হলে ম্যাচটা অন্তত টাইব্রেকারে যেত।

তা যখন হলোই না, বাংলাদেশের ক্রিকেটীয় আক্ষেপগাথায় আরও একটি অধ্যায় যুক্ত হলো। ১ রানে এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো হারল বাংলাদেশ। অবশেষে বাংলাওয়াশের শিকার হতে হলো বাংলাদেশকেই। আফগানিস্তান এই প্রথম জিম্বাবুয়ে ছাড়া টেস্ট খেলুড়ে আর কোনো দলকে টি-টোয়েন্টিতে ধবলধোলাই করল।

বাংলাদেশের চেষ্টা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। জয়ের জন্য শেষ ৫ ওভারে ৫৫ রান দরকার ছিল বাংলাদেশের। হাতে ৬ উইকেট। ৫ ওভারের মধ্যে রশিদেরই তিনটি ওভার। ১৬তম ওভারে মাত্র ৭ রান দেন এই লেগ স্পিনার। বুঝিয়ে দিলেন অধিনায়ক কেন জমিয়ে রেখেছিলেন তাঁকে। ১৮তম ওভারে দিলেন মাত্র ৩ রান। অর্থাৎ জয়ের জন্য শেষ ১২ বলে বাংলাদেশের দরকার ছিল ৩০ রান। কিন্তু মুশফিকুর রহিমের বীরত্ব তখনো বাকি ছিল।

করিম জান্নাতের করা ১৯তম ওভারে টানা পাঁচ চার মারেন মিডল অর্ডারের এই স্তম্ভ। এই ওভারে ২১ রান নিয়ে শেষ ৬ বলে লক্ষ্যটাকে ৯ রানে নামিয়ে আনেন মুশফিক। কিন্তু রশিদের করা ২০তম ওভারের প্রথম বলেই মুশফিক (৩৭ বলে ৪৬) আউট হলে জমে ওঠে ‘থ্রিলার’। মাহমুদউল্লাহ-আরিফুল মিলে পরের ৩ বলে নিতে পেরেছেন মাত্র ৫ রান। শেষ বলে দরকার ছিল ৪ রান। তার পরই সেই নাটক!

১ রানে হারলে অনেক কিছু নিয়েই আক্ষেপ জাগে। সবচেয়ে বেশি আক্ষেপ জাগছে ষষ্ঠ ওভারে ওইরকম অবিশ্বাস্য দুটি ‘আত্মহত্যা’ নিয়ে। একই ওভারে চার বলের মধ্যে দুটি কপি-পেস্ট রান আউট! লিটন দাস ও তামিম ইকবাল মিলে প্রথম দুই ওভারে ১১ রান তুলেছিলেন। তামিমকে এই সিরিজের শুরু থেকেই কিছুটা অস্থির দেখা গেছে। আজও ঠিক তাই। তৃতীয় ওভারে মুজিব উর রহমানকে উড়িয়ে মারতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন এক্সট্রা-কভারে। তামিম এই শটটা খেলতে পছন্দ করেন তা ঠিক, কিন্তু মন্থর ও স্পিনবান্ধব উইকেটে সিরিজ হেরে দল যখন চাপে তখন একটু ধৈর্য ধরার প্রয়োজন ছিল বৈকি।

তামিম আউট হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল লিটন ও সৌম্য সরকারের ধৈর্য ধরার। কিন্তু ষষ্ঠ ওভারে তাঁদের অবিশ্বাস্য দুটি দৌড় দেখে মনে হয়েছে জিততে হবে ওই ওভারেই! টিভি সেটের সামনে যাঁরা এই দৃশ্য দেখেছেন তাঁরাও নিশ্চয়ই চোখ রগড়ে ভেবেছেন, ভুল দেখলাম না তো! সম্ভবত রিপ্লে দেখাচ্ছে!
আসলে তা নয়। আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকলে যা হয়, লিটন ও সৌম্যর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। মোহাম্মদ নবীর সেই ওভারের দ্বিতীয় বলে সুইপ করেছিলেন লিটন। বল শর্ট ফাইন লেগে ফিল্ডারের হাতে জমা পড়ার আগে ১ রান চুরি করতে সৌম্যকে ‘কল’ দিয়েছিলেন তিনি। সেটা যেমন ভুল ছিল তেমনি সৌম্যও বিপদ না বুঝেই দৌড়েছেন অন্ধের মতো। উইকেটের অর্ধেক পথ পেরিয়ে যাওয়ার পর সৌম্য (১৫) ভুল বুঝতে পেরে ফেরার চেষ্টা করলেও ততক্ষণে করিম জান্নাতের থ্রো থেকে নবী উইকেট ভেঙে দিয়েছেন।

সৌম্যর এই ভুল থেকে লিটন শিক্ষা নিতে পারতেন। আগের দুই ম্যাচের হার থেকে গোটা দল যেমন শিক্ষা নিতে পারত। কিন্তু সেটা যেমন হয়নি তেমনি লিটনও শিক্ষা নেননি। পার্থক্য শুধু এবার স্ট্রাইকে মুশফিক আর ডেলিভারিটা ছিল ওভারের পঞ্চম। তা ছাড়া বাকি সব একই রকম। মুশফিক অবশ্য লিটনকে ‘কল’ দেননি। কিন্তু সৌম্যর মতো লিটনও (১২) দৌড়েছেন অন্ধের মতো। ফল সেই একই—রান আউট। অথচ এবারও বল সেই শর্ট ফাইন লেগে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা ফিল্ডারের হাতে। অর্ধেক রানও যেখানে হয় না, সেখানে রান নিতে গেলে কী বিপদ হবে সেটা মাত্র তিন বল আগেই দেখা গেছে। তবু কী বুঝে ওই দৌড়!

মুশফিক-সাকিব চতুর্থ উইকেটে এই বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু নবম ওভারে দুর্দান্ত ক্যাচে সাকিবকে ফিরিয়ে দেন শেনওয়ারি। এখান থেকে পাল্টা আক্রমণে মুশফিক-মাহমুদউল্লাহ জয়ের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন ৮৪ রানের জুটিতে। কিন্তু জয়ের সব বন্দোবস্ত করেও শেষ পর্যন্ত কপালে ধবল ধোলাই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *